বাংলা ক্যালেন্ডার বিডি
রাজশাহীতে একটি পরিবারের ঘরোয়া দৃশ্য লোকসাহিত্য

বাংলার রূপকথা

শীতের রাতে দিদিমার কোলে মাথা রেখে "এক দেশে ছিল এক রাজা" শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া — এই দৃশ্যটাই বোধহয় বাংলার রূপকথার আসল ঠিকানা। রাজপুত্র-রাজকন্যা, দৈত্য-দানব, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের সেই জগৎ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি শিশুর কল্পনায় রঙ ছড়িয়ে এসেছে।

মুখে মুখে বাঁচা একটা ঐতিহ্য

রূপকথা আসলে মৌখিক সাহিত্য — লেখা হওয়ার অনেক আগে থেকেই এসব গল্প দাদি-নানি-ঠাকুরমার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। কোনো নির্দিষ্ট লেখক নেই এসব গল্পের। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিটা কথক নিজের মতো করে একটু রঙ চড়িয়ে গল্পগুলোকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এই মৌখিক ঐতিহ্যই বাংলার রূপকথাকে করে তুলেছে এত প্রাণবন্ত, এত বৈচিত্র্যময়।

ঠাকুরমার ঝুলি ও দক্ষিণারঞ্জন

বাংলার রূপকথাকে বই আকারে ধরে রাখার কৃতিত্বটা মূলত দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের (১৮৭৭-১৯৫৭)। প্রায় দশ বছর ধরে ময়মনসিংহ অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন বাংলার লুপ্তপ্রায় কথাসাহিত্য। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের পরামর্শে এই সংগ্রহকে চার ভাগে ভাগ করা হয় — রূপকথা, গীতিকথা, ব্রতকথা, রসকথা। এখান থেকেই ১৯০৭ সালে বেরোয় "ঠাকুরমার ঝুলি", বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এরপর একে একে "ঠাকুরদাদার ঝুলি", "ঠানদিদির থলে", "দাদামশায়ের থলে"। মুখের কথাকে প্রায় অবিকৃত রেখে ছাপার অক্ষরে বেঁধে রাখার এই কাজের জন্যই দক্ষিণারঞ্জনকে ডাকা হয় বাংলা রূপকথার জনক নামে।

চেনা এক জগৎ, বারবার ফিরে আসে

বাংলার রূপকথায় কিছু চরিত্র-কাঠামো বারবার ফিরে আসে — রাজা-রানি, সাত রাজপুত্র আর এক রাজকন্যা, রাক্ষস-খোক্কস, দৈত্য-দানব, যাদের প্রাণভোমরা লুকানো থাকে সুদূর কোনো দ্বীপের সোনার কৌটায়। সৎমায়ের নির্যাতনে জর্জরিত সৎকন্যার কাহিনি, বুদ্ধিমান কাঠুরে বা জেলের ছেলের ভাগ্য ফেরার গল্প, আর শিয়াল পণ্ডিতের মতো চতুর পশুচরিত্র যারা বুদ্ধি দিয়েই হারিয়ে দেয় বলবানকে। এসব গল্পের ভেতরে মিশে থাকে বাংলার গ্রামীণ জীবন, নদী-জঙ্গল, আর মানুষের লোকবিশ্বাস।

গল্পের আড়ালে একটা শিক্ষাও থাকে

প্রতিটা রূপকথার পেছনে লুকিয়ে থাকে একটা নৈতিক শিক্ষা — সততার জয়, লোভের পরিণতি, বুদ্ধির শক্তি, ভালোবাসার জোর। ছোটবেলায় নিছক বিনোদনের ছলে যে গল্পগুলো শুনতাম, সেগুলোই আসলে শিশুমনে গেঁথে দিত মূল্যবোধ আর কল্পনাশক্তি — একসাথে দুটো কাজ, অথচ শিশু টেরও পেত না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লিখেছিলেন, রূপকথা শুনে বাঙালির শিশু কেবল গল্প শুনেই আনন্দিত হয় না, বাংলাদেশের চিরন্তন স্নেহের সুরও তার মনে প্রবেশ করে।

আজকের প্রজন্মের কাছে

টেলিভিশন আর মোবাইল স্ক্রিনের এই যুগে দিদিমার কোলে বসে গল্প শোনার সেই চেনা দৃশ্য এখন বিরল হয়ে আসছে। ঠাকুরমার ঝুলির গল্পগুলো বই আকারে এখনও টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু মুখে মুখে গল্প বলার যে জীবন্ত ঐতিহ্য একসময় রূপকথাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখত, সেটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। তবু প্রতি বছর ঠাকুরমার ঝুলির নতুন সংস্করণ ছাপা হয়, অ্যানিমেশনেও রূপান্তরিত হচ্ছে গল্পগুলো — এটাই বলে দেয়, বাংলার এই রূপকথা আজও বাঙালির হৃদয়ে সমান প্রিয়।

← লেখা তালিকায় ফিরে যাও