বাংলা ক্যালেন্ডার বিডি
খুলনার সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন লোককাহিনি

দেওয়ান গাজী কালুর কিচ্ছা

এক সময় দক্ষিণবঙ্গের গ্রামে গ্রামে রাত জেগে মানুষ শুনত এই কাহিনি — বাঘ আর কুমির নাকি একই ঘাটে শান্তিতে জল খেত, এমন এক পীরের নামে যাঁর ভালোবাসা ছিল এক হিন্দু রাজকন্যার প্রতি। আজ সেই কিচ্ছা টিকে আছে কেবল হাতে গোনা কিছু বয়াতির গলায়, আর প্রবীণদের স্মৃতিতে।

কাহিনির মূল সুর

গাজী কালু ও চম্পাবতী মধ্যযুগের পাঁচালি কাব্যের ধাঁচে লেখা এক বিখ্যাত পীরসাহিত্য। কাহিনির কেন্দ্রে গাজী পীর — মুসলিম সুফি সাধক, ধর্মপ্রচারক, আবার যোদ্ধা হিসেবেও সম্মানিত। তাঁর সাথে সবসময় থাকতেন কালু, অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী — দুজনের নাম মিলিয়েই হয়ে গেছে "গাজী কালু"। পুঁথির বর্ণনায় গাজী পীরের বংশপরিচয় খুঁজে পাওয়া যায় রাজবংশীয় ধারায়, যিনি পরে সংসার ছেড়ে ফকির হয়ে যান।

গাজী আর চম্পাবতীর প্রেম

কাহিনির প্রাণকেন্দ্র গাজী পীরের সাথে হিন্দু রাজকন্যা চম্পাবতীর প্রেম। চম্পাবতীর টানে গাজী ছুটে যান ছাপাইনগরে, আজকের বারোবাজারে — সেখানকার রাজা মুকুট ছিলেন চম্পাবতীর বাবা, আর এই সম্পর্কে তিনি ছিলেন ক্ষুব্ধ। কাহিনি বলে, ছাপাইনগরের বলিহর বাওরের তমাল গাছের তলায় গাজী নিয়মিত অপেক্ষা করতেন চম্পাবতীর জন্য — অনেক বাধা পেরিয়ে টিকে থাকা এক প্রেমের গল্প।

বাঘ-কুমিরের সেই বিশ্বাস

গাজী কালুর কিচ্ছার সবচেয়ে চেনা অংশ হয়তো এই লোকবিশ্বাসটাই — তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবে বাঘ আর কুমির একই ঘাটে জল খেত, কোনো লড়াই ছাড়াই। ব্যাঘ্রসংকুল দক্ষিণবঙ্গে এই বিশ্বাস থেকেই গাজী পীরকে দেওয়া হতো বাঘের হাত থেকে রক্ষাকারীর মর্যাদা — সুন্দরবন আর তার আশেপাশের জেলে-মৌয়ালদের কাছে তিনি ছিলেন এক আশ্রয়ের নাম। ঐতিহাসিকরা বলছেন, বাঘদেবতা দক্ষিণ রায়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে গাজী পীরের প্রথম উল্লেখ মেলে কৃষ্ণরাম দাসের লেখায়।

আজও যেখানে বিশ্বাস অটুট

বরগুনার আমতলী উপজেলার টেপুরা গ্রামে আজও আছে গাজী কালুর মাজার। মাজারের প্রকৃত বয়স বা ভেতরে সমাধি আছে কি না — এসব নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই কারো কাছেই। তবু দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন মানত করতে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। স্থানীয়দের কাছে এই মাজার শুধু একটা স্থাপনা নয়, তাদের ঐতিহ্যের একটা অংশ।

পালা গান হিসেবে টিকে থাকা

একসময় গাজী কালুর কিচ্ছা গ্রামে গ্রামে মুখে মুখে ফিরত পালাগান হিসেবে, রাত জেগে শোনা হতো। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে আজও মাঝেমধ্যে বয়াতিরা এই পালা গেয়ে ওঠেন — মানুষ এখনও আগ্রহ নিয়ে শোনে, যদিও এমন আসর আর আগের মতো নিয়মিত বসে না।

কেন কমে আসছে এই আসর

আধুনিক বিনোদনের চাকচিক্য আর সহজলভ্য প্রযুক্তির ভিড়ে গাজীর গানের কদর দিন দিন কমছে। যাঁরা এই পালা গাইতে জানেন তাঁদের সংখ্যা হাতে গোনা, তরুণ প্রজন্মের কাছে এই শিল্প প্রায় অচেনা। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো এই প্রজন্মের পরে আর কেউ জানবেই না গাজী কালুর এই কিচ্ছা — মুখে মুখে বেঁচে থাকা একটা ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বাক্সবন্দি হয়ে যাচ্ছে।

রুপালি পর্দায় একবার

১৯৬৯ সালে অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের অভিনয়ে তৈরি হয়েছিল "গাজী কালু চম্পাবতী" চলচ্চিত্র — বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এই কাহিনি নিয়ে এখনও পর্যন্ত এটাই একমাত্র উল্লেখযোগ্য নির্মাণ। আজও এই সিনেমাটাই সাক্ষ্য দেয়, একসময় এই লোককাহিনি ঠিক কতটা জনপ্রিয় ছিল।

← লেখা তালিকায় ফিরে যাও