বাংলা ক্যালেন্ডার বিডি
মাঠের মধ্যে ক্যাসেট প্লেয়ার হাতে একজন নারী, সাদা-কালো ছবি লোকসংস্কৃতি

হারিয়ে যাওয়া গানের কথা

নৌকার দাঁড় টানতে টানতে একটা গান, ধানকাটার সময় আরেকটা সুর, শোকের রাতে অন্য এক গান — বাংলার প্রতিটা মুহূর্তের নিজস্ব সুর ছিল একসময়। আজ সেই সুরগুলো একটা একটা করে থেমে যাচ্ছে, বেঁচে আছে শুধু প্রবীণদের স্মৃতিতে।

নদীর সাথে বাঁধা যে গান

সারিগান আর ভাটিয়ালি ছিল নদীমাতৃক পূর্ববাংলার প্রাণের সুর। মাঝিমাল্লারা দাঁড় টানতে টানতে সারিবদ্ধভাবে গাইতেন সারিগান, আর ভাটিয়ালি গাওয়া হতো একক কণ্ঠে — নদী, জল, জেলেজীবনের আবেগঘন সব রূপক নিয়ে। কিন্তু নদী-খাল-বিল যেভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে, মাঝিমাল্লার পেশাও যেভাবে কমে আসছে, এই গানগুলোও একই পথে হাঁটছে। নদী নিজেই যখন বিপন্ন, তার বুকে বাজা সুরও তো আর টিকে থাকার জায়গা পায় না।

শোক, ভক্তি আর বিদ্রুপের গান

জারিগান এসেছে ফার্সি শব্দ থেকে, যার অর্থ শোক। সপ্তদশ শতক থেকে মহররমে কারবালার বিয়োগান্তক কাহিনী স্মরণ করে গাওয়া হতো এই গান। পাশাপাশি প্রচলিত ছিল মুর্শিদি, মারফতি, বাউলগানের মতো আধ্যাত্মিক ধারা, আর কবিগান-পাঁচালীগান-আখড়াই গানের মতো রীতি — যেখানে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি শাসকের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গও জায়গা পেত। রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব আসর একসময় জমজমাট থাকত। সেই পৃষ্ঠপোষকতা যেদিন উঠে গেল, আসরগুলোও থেমে গেল প্রায় একইসাথে।

এখনও যেখানে টিকে আছে শেষ চিহ্নটুকু

গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকা একসময় লোকগানের পীঠস্থান ছিল, জারি-সারি-পালা আর ভাওয়ালী গানে ভরপুর। স্থানীয় গবেষকরা বলছেন, এখনই কিছু না করলে আগামী দশ বছরে এই গানগুলো শুধু জাদুঘরের জিনিস হয়ে থাকবে। তবু আজও কালিয়াকৈরের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে রাত জেগে জারি-সারি-পালাগানের আসর বসে — বয়োজ্যেষ্ঠরা এখনও সেই সুরের টানে জড়ো হন, চায়ের কাপ হাতে।

কেন থেমে যাচ্ছে এই সুর

মোবাইলের স্ক্রিনেই এখন গোটা দুনিয়ার গান হাতের মুঠোয় — নতুন প্রজন্মের রুচি বদলাবে না তো কী হবে। গ্রাম ক্রমশ শহরের চেহারা নিচ্ছে, লাঙল-ঢেঁকির যে জীবনযাত্রার সাথে এই গানগুলো জড়িয়ে ছিল, সেটাই আজ প্রায় বিলুপ্ত। আর জীবনযাত্রা বদলে গেলে গান বাঁচার প্রাকৃতিক পরিবেশটাও হারিয়ে যায় — শুধু সুর মুখস্থ করলেই তো একটা লোকগানের আসল প্রাণ ফিরে আসে না।

যা আসলে হারাই আমরা

প্রতিটা লোকগান আসলে একেকটা অঞ্চলের ইতিহাস, ভাষা আর জীবনবোধের দলিল। একসময় বাংলাদেশে পাঁচ ধরনের ভাটিয়ালির প্রচলন ছিল — প্রতিটার নিজস্ব ভৌগোলিক ছাপ, নিজস্ব সুরভেদ। তার কিছু রূপ এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। এই গান হারানো মানে শুধু সুর হারানো নয় — একটা জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত স্মৃতির একটা টুকরো হারানো।

যা করা যেতে পারে

কিছু গবেষক এখনও লোকগান সংকলন আর নথিবদ্ধ করার কাজে লেগে আছেন — মূল গীতিকার, সুর, কথাসহ প্রামাণ্য দলিল তৈরি করছেন, যাতে অন্তত কাগজে-কলমে এই ঐতিহ্য টিকে থাকে। তবে একটা লোকগান তার আসল পরিবেশ আর পরিবেশনাশৈলী ছাড়া পুরোপুরি বাঁচে না। তাই দরকার শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা, তরুণদের এই সুরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, আর জীবন্ত আসরগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।

← লেখা তালিকায় ফিরে যাও