নস্টালজিয়া
নস্টালজিক নব্বই: যে দিনগুলো আর ফিরবে না
একটা ছেলে বিকেলবেলা মাঠ থেকে ঘাম মুছতে মুছতে বাসায় ফিরছে, কারণ একটু পরেই শুরু হবে সপ্তাহের একমাত্র নাটক। কোনো রিমোট কন্ট্রোল হাতে খোঁজাখুঁজি নেই — চ্যানেল তো একটাই। এই ছোট্ট দৃশ্যটাই বোধহয় গোটা নব্বই দশকের বাংলাদেশকে এক লাইনে বলে দেয় — কম থাকার মধ্যেও কীভাবে একটা জীবন ভরপুর হয়ে উঠত।
একটা চ্যানেলের জগৎ
বিটিভি ছাড়া তখন আর কিছু ছিল না, আর অদ্ভুতভাবে সেটাই যথেষ্ট মনে হতো। সপ্তাহে একদিন নাটক, শুক্রবারে সিনেমা, সন্ধ্যায় সংবাদ — পুরো পরিবার তখন একসাথে বসত একটামাত্র টিভির সামনে। কোনো চ্যানেল পাল্টানোর বিতর্ক ছিল না, কারণ পাল্টানোর কিছুই ছিল না। এখন ভাবলে অবাক লাগে, এতটুকুতেই কীভাবে গোটা দেশ একসাথে হাসত, একসাথে কাঁদত।
যে অনুষ্ঠানগুলো মিস করা যেত না
ম্যাজিক লণ্ঠনের সেই রহস্যময় জাদু, ইত্যাদির স্যাটায়ার আর গান, দেশ-বিদেশের সিনেমা নিয়ে চিত্রালীর পাতা উল্টানো — এসবের একেকটা ছিল সপ্তাহের ক্যালেন্ডারের অংশ। শুক্রবার দুপুরের সিনেমা শুরু হওয়ার আগে ঘরে ঘরে ভাত খাওয়ার তাড়া পড়ে যেত, কারণ সিনেমা শুরু হয়ে গেলে আর কেউ প্লেট নিয়ে উঠত না। বিজ্ঞাপন বিরতিতে দৌড়ে বাথরুম সেরে আসাটাও ছিল একটা কৌশল — কারণ বিজ্ঞাপন শেষ হলেই আবার পর্দায় চোখ রাখতে হতো।
রেডিওর ধারাভাষ্য আর ক্রিকেটের উত্তেজনা
টিভিতে খেলা না দেখাতে পারলে রেডিও ছিল ভরসা। কানের কাছে রেডিও ধরে ধারাভাষ্য শোনা, বল বাউন্ডারিতে গেলেই সারা পাড়ায় চিৎকার — এই দৃশ্য তখন অতি সাধারণ ছিল। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জেতার পর সারা দেশ যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল, সেই আনন্দের স্মৃতি আজও অনেকের চোখে জ্বলজ্বল করে। খেলা শেষে পাড়ার চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলার বিশ্লেষণ চলত — কোনো সোশ্যাল মিডিয়া লাগত না, মুখে মুখেই যথেষ্ট ছিল।
চিঠি আর অপেক্ষার সুখ
মোবাইল তো দূরের কথা, বাসায় ল্যান্ডফোন থাকাটাই ছিল বিলাসিতা। দূরের আত্মীয়ের খবর পেতে চিঠিই ছিল ভরসা — পোস্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টি শুনলেই দৌড় দিত ছেলেমেয়েরা। একটা চিঠি লিখে পাঠানোর পর উত্তর আসতে লাগত দিন, কখনো সপ্তাহ। যাদের বাসায় ল্যান্ডফোন থাকত না, তারা জরুরি খবরের জন্য প্রতিবেশীর বাসায় গিয়ে ফোন করত, আর এসটিডি কল করতে হলে পোস্ট অফিসের বুথে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হতো। আজকের হিসেবে সেটা অসম্ভব ধীর মনে হবে, কিন্তু সেই অপেক্ষার মধ্যেই ছিল একটা আলাদা আনন্দ — যা তাৎক্ষণিক মেসেজিং কখনো দিতে পারে না।
বিকেল মানেই মাঠ
স্কুল শেষে বাসায় ব্যাগ ফেলেই সোজা দৌড় মাঠে। কানামাছি, দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, মার্বেল, ডাংগুলি, লাটিম, ঘুড়ি ওড়ানো — কোনো অ্যাপ লাগত না, লাগত শুধু কয়েকজন বন্ধু আর একটুখানি খোলা জায়গা। কাগজের ঘুড়ি নিজেরাই বানানো হতো, সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার সেই গোপন রেসিপিও ছিল পাড়ার বড় ভাইদের কাছ থেকে শেখা এক গর্বের বিষয়। সন্ধ্যার আজান পড়লে তবেই বাসায় ফেরার তাড়া পড়ত, আর সারা গায়ে ধুলো-মাটি মেখে ফেরাটাই ছিল একটা সফল দিনের প্রমাণ।
স্কুলজীবনের ছোট ছোট আনন্দ
টিফিন পিরিয়ডে বন্ধুদের সাথে টিফিন ভাগাভাগি করে খাওয়া, ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে কমিকস পড়া — টিনটিন, চাচা চৌধুরী, বিল্লু — এসবই ছিল সেই সময়ের ছোট ছোট বিলাসিতা। পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার দিন স্কুল গেটে ভিড় করা অভিভাবকদের সেই উৎকণ্ঠা, আর রেজাল্ট ভালো হলে বাসায় ফেরার পথে মিষ্টির দোকানে থামা — এই ছোট ছোট রুটিনগুলোই তৈরি করত জীবনের বড় স্মৃতি।
ভিসিআর আর ভাড়ার ক্যাসেট
পাড়ার কোনো একটা বাসায় যাদের ভিসিআর ছিল, সেই বাসাটাই হয়ে উঠত ছুটির দিনের আকর্ষণ। ভিডিওর দোকান থেকে টাকা দিয়ে ক্যাসেট ভাড়া করে আনা হতো, তারপর প্রতিবেশীরা মিলে গাদাগাদি করে বসে সিনেমা দেখা। ক্যাসেট প্যাঁচিয়ে গেলে পেনসিল দিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক করার সেই কৌশলটা তখনকার প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই কেউ না কেউ জানত। গান শোনার জন্য ছিল ওয়াকম্যান আর ক্যাসেট প্লেয়ার — প্রিয় গানগুলো নিজে হাতে বেছে বেছে একটা ক্যাসেটে রেকর্ড করে "মিক্সট্যাপ" বানানোটাও ছিল একটা শিল্প।
ঈদের প্রস্তুতি ছিল অন্যরকম
ঈদের আগের রাতে হাতে মেহেদি দেওয়া, দর্জির দোকানে জামা বানানোর জন্য লাইন, বাজারে নতুন জুতোর খোঁজ — সবকিছুতেই ছিল অনেকদিনের অপেক্ষার একটা আমেজ। ঈদ কার্ড কিনে বা নিজে হাতে বানিয়ে বন্ধু-আত্মীয়দের পাঠানো ছিল আরেকটা প্রিয় রীতি — ডাকে পাঠানো সেই কার্ডগুলো পৌঁছাতে দিন কয়েক লাগলেও, সেই অপেক্ষাটাই ছিল আনন্দের একটা অংশ। এখনকার মতো একটা ক্লিকে অর্ডার করে পরদিনই জামা হাতে পাওয়ার সুযোগ ছিল না, তাই প্রতিটা প্রস্তুতিই মনে হতো নিজের হাতে গড়া একটা উৎসব।
ফেরিওয়ালার হাঁক আর পাড়ার আওয়াজ
সকালবেলা "বুড়ি আইসক্রিম" বা বিকেলে ঝালমুড়িওয়ালার হাঁক, চুড়িওয়ালা বা বাসনওয়ালার নিয়মিত ফেরি — এই আওয়াজগুলোই ছিল পাড়ার ঘড়ি, যা দিয়ে বোঝা যেত দিনের কোন সময় চলছে। কাগজ-বাস্তুকুড়া কুড়ানো ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে কুলফি বিক্রেতা — প্রতিটা চরিত্রই ছিল পাড়ার পরিচিত মুখ, যাদের ডাক শুনেই বোঝা যেত আজ কী খাওয়া যাবে।
কেন এই স্মৃতিগুলো এত মিষ্টি
আজকের প্রজন্মের কাছে এসব গল্প হয়তো রূপকথার মতো শোনাবে — একটা চ্যানেল, চিঠির অপেক্ষা, রিমোটবিহীন টিভি, ফেরিওয়ালার হাঁকে সময় বোঝা। কিন্তু যারা সেই সময় পার করে এসেছে, তাদের কাছে এই সীমাবদ্ধতাগুলোই ছিল আসলে এক ধরনের স্বাধীনতা — কম থাকার মধ্যেও ভরপুর একটা জীবন। প্রযুক্তি এগিয়েছে, সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু সেই ধীরগতির, একসাথে-থাকা দিনগুলোর একটা আলাদা মূল্য ছিল, যা আজও অনেকের মনে নাড়া দেয়।
হয়তো এই কারণেই "নব্বইয়ের দশক" শব্দটা শুনলেই এখনও একটা মৃদু হাসি ফুটে ওঠে অনেকের মুখে — কারণ সেই দিনগুলো ফিরে আসবে না ঠিকই, কিন্তু স্মৃতিতে চিরকাল থেকে যাবে।
← লেখা তালিকায় ফিরে যাও