বাংলা ক্যালেন্ডার বিডি
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিসহ তারাভরা রাতের আকাশ

লেখা · বাংলা সন

আকাশের তারা থেকে আমাদের ১২ মাস

বাংলা মাসের নামকরণের রোমাঞ্চকর গল্প — কীভাবে হাজার বছর আগের জ্যোতির্বিদদের চোখে-দেখা রাতের আকাশ আজও আমাদের ক্যালেন্ডারে বেঁচে আছে।

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আমরা প্রতিদিন বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় বলে মাসের নাম উচ্চারণ করি, কিন্তু ক'জন জানি এই নামগুলো এসেছে কোথা থেকে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে রাতের আকাশে — সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, চাঁদ যে তারার দলের কাছ দিয়ে পূর্ণিমার রাতে অতিক্রম করে, সেই তারার দলের (নক্ষত্র) নাম থেকেই এসেছে সেই মাসের নাম।

প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানে আকাশকে ২৭টি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল, প্রতিটি ভাগের নাম একটি নির্দিষ্ট তারামণ্ডলীর (নক্ষত্রের) নামে। চাঁদ প্রতি মাসে যে নক্ষত্রের কাছ দিয়ে পূর্ণিমায় অতিক্রম করত, সেই নক্ষত্রের নাম অনুসারেই মাসের নামকরণ করা হয়েছিল। এভাবেই জন্ম নিয়েছে আমাদের পরিচিত ১২টি বাংলা মাসের নাম। আজকের বাংলা তারিখ বা পঞ্জিকা দেখলে তুমি এই একই নাক্ষত্র হিসাবের ফলাফলই দেখতে পাবে।

মাস আর তার নক্ষত্র

  1. ০১

    বৈশাখ

    এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে। বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস, যা তুলা ও বৃশ্চিক রাশির মাঝামাঝি অবস্থিত একটি তারামণ্ডলীর নামে নামাঙ্কিত।

  2. ০২

    জ্যৈষ্ঠ

    এসেছে জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র থেকে — বৃশ্চিক রাশির প্রধান তারা, যা আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল লাল তারা হিসেবে পরিচিত।

  3. ০৩

    আষাঢ়

    এসেছে আষাঢ়া (পূর্বাষাঢ়া/উত্তরাষাঢ়া) নক্ষত্র থেকে। বর্ষার প্রথম মাস, যার নাম ধনু রাশির একটি তারামণ্ডলী থেকে নেওয়া।

  4. ০৪

    শ্রাবণ

    এসেছে শ্রবণা নক্ষত্র থেকে — মকর রাশির একটি তারামণ্ডলী, যাকে অনেক সময় ঈগল বা agila-র ডানার সাথে তুলনা করা হয়।

  5. ০৫

    ভাদ্র

    এসেছে ভাদ্রপদা (পূর্বভাদ্রপদ/উত্তরভাদ্রপদ) নক্ষত্র থেকে, যা কুম্ভ ও মীন রাশির সীমানায় অবস্থিত একজোড়া তারার নাম।

  6. ০৬

    আশ্বিন

    এসেছে অশ্বিনী নক্ষত্র থেকে — মেষ রাশিতে অবস্থিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে নক্ষত্রচক্রের প্রথম নক্ষত্র হিসেবে গণ্য।

  7. ০৭

    কার্তিক

    এসেছে কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে — বৃষ রাশির বিখ্যাত সপ্তর্ষি/প্লিয়েডিস তারাগুচ্ছ, যা রাতের আকাশে খালি চোখেই স্পষ্ট দেখা যায়।

  8. ০৮

    অগ্রহায়ণ

    এসেছে অগ্রহায়ণী (মৃগশিরা) নক্ষত্র থেকে। কৃষিভিত্তিক পঞ্জিকায় একসময় এই মাসকেই বছরের প্রথম মাস ধরা হতো, তাই নাম "অগ্র" (প্রথম)।

  9. ০৯

    পৌষ

    এসেছে পুষ্যা নক্ষত্র থেকে — কর্কট রাশির একটি শুভ তারামণ্ডলী, যাকে সমৃদ্ধি ও পুষ্টির প্রতীক ধরা হয়।

  10. ১০

    মাঘ

    এসেছে মঘা নক্ষত্র থেকে — সিংহ রাশির প্রধান তারামণ্ডলী, যার নামের অর্থ "মহৎ" বা "শক্তিশালী"।

  11. ১১

    ফাল্গুন

    এসেছে ফাল্গুনী (পূর্বফাল্গুনী/উত্তরফাল্গুনী) নক্ষত্র থেকে — সিংহ ও কন্যা রাশির সীমানায় অবস্থিত একজোড়া তারা।

  12. ১২

    চৈত্র

    এসেছে চিত্রা নক্ষত্র থেকে — কন্যা রাশির উজ্জ্বলতম তারা, যা বছরের শেষ মাসকে বিদায়ী রঙে রাঙিয়ে তোলে।

নক্ষত্র থেকে ক্যালেন্ডার

এই পদ্ধতিকে বলা হয় "নাক্ষত্র মাস গণনা" — যেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান আর কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা একে অপরের সাথে জড়িয়ে গেছে। প্রাচীনকালে কৃষকরা আকাশের এই তারামণ্ডলী দেখেই বুঝে নিতেন কখন বীজ বুনতে হবে, কখন ফসল কাটতে হবে, কখন বর্ষা আসবে — আজও আমাদের কৃষি ক্যালেন্ডার পাতায় সেই একই ঋতুভিত্তিক জ্ঞানের প্রতিফলন দেখা যায়।

আজ হাজার বছর পরেও, আমরা যখন ক্যালেন্ডারে বৈশাখ বা কার্তিক মাসের কথা বলি, তখন না জেনেই আমরা সেই প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের চোখে দেখা রাতের আকাশকেই স্মরণ করি — যাঁরা তারার আলোয় সময়ের হিসেব রেখেছিলেন আমাদের জন্য।