বাংলা ক্যালেন্ডার বিডি
হাতে ধরা তাজা মাছ, চট্টগ্রাম প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য

বাংলার হারিয়ে যাওয়া মাছের কথা

ছোটবেলায় যে মাছগুলোর নাম শুনতাম দাদির মুখে, আজকের বাজারে সেগুলো খুঁজে পাওয়াই কঠিন। বাংলার নদী-খাল-বিল একসময় ছিল দেশি মাছের এক বিশাল ভাণ্ডার — আজ সেই ভাণ্ডার অনেকটাই খালি।

যখন জলাশয় ভরা ছিল মাছে

কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসাব বলছে, দেশে মিঠাপানির বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজাতি এখন ৬৪টি — এর মধ্যে আছে টেংরা, মহাশোল, সরপুঁটি, টাটকিনি, বাগাড়, রিঠা, পাঙাশ, চিতলের মতো পরিচিত নামও। সংখ্যাটা আরও স্পষ্ট হয় সিলেটের হাকালুকি হাওরের একটা জরিপে — সেখানে একসময় ১০৭ প্রজাতির দেশি মাছ ছিল, আর এখন টিকে আছে মাত্র ৪৪টি। বাকিগুলো কার্যত নেই বললেই চলে।

নামগুলো যেন ভুলে যাওয়া গান

চাপিলা, বৈচা, চাটুয়া, চাঁদা, নামা চাঁদা, গোল চাঁদা, আইড়, গুলশা, পাবদা, দেশি পুঁটি, সরপুঁটি, তিতপুঁটি, মেনি, শিং, কই, টাকি, শোল, গজার, ফলি, চিতল, মলা, ঢেলা, কানপোনা, দারকিনা, খয়রা, বাচা, বাটা, রিটা, চ্যাং, কালবাউশ, বাঘাইর, বড় বাইম, তারা বাইম, শালবাইম, কুচিয়া, পটকা — এই নামগুলো একসময় ছিল বাঙালির রোজকার খাবারের অংশ। আজকের প্রজন্মের কাছে এই তালিকার বেশিরভাগ নামই অচেনা, যেন বিদেশি কোনো শব্দ।

কেন এভাবে হারিয়ে গেল

জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে জলাশয় সংকুচিত হয়েছে, নদী-খাল ভরাট হয়ে পরিণত হয়েছে কৃষিজমি বা বসতিতে। এর ওপর যোগ হয়েছে কীটনাশক আর রাসায়নিক সারের দূষণ — যা ছোট মাছের বংশবৃদ্ধির জন্য সরাসরি ক্ষতিকর। অতিরিক্ত মাছ ধরা তো আছেই, তার সাথে আছে আরেকটা নিষ্ঠুর বাস্তবতা — পুকুরে বাণিজ্যিক মাছ চাষের আগে দেশি ছোট মাছ বিষ দিয়ে মেরে ফেলার প্রবণতা। ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক না হওয়ায় এসব মাছের প্রতি কারো তেমন আগ্রহও নেই আর।

যাদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ

সিলেটের হাওর অঞ্চলে একসময় সহজলভ্য রানী মাছ আজ বিলুপ্তির পথে — শুধু একটা প্রজাতির ক্ষতি নয়, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্যই এটা উদ্বেগের কারণ। সুস্বাদু আর দেখতে সুন্দর বৌরাণী মাছও দেশের নদী থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে — অথচ বিদেশে অ্যাকুরিয়ামের মাছ হিসেবে এর চাহিদা প্রচুর, এই বৈপরীত্যটাই একটু অদ্ভুত লাগে।

যা আসলে হারাচ্ছি আমরা

এই ছোট মাছগুলো শুধু স্বাদে নয়, পুষ্টিতেও অনন্য ছিল — ভিটামিন, খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ, যা বড় চাষের মাছে সচরাচর মেলে না। এদের হারানো মানে শুধু একটা খাবার হারানো নয় — পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের একটা অংশ ভেঙে পড়া।

যেটুকু করা যায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে এই ক্ষতি আর ফেরানো যাবে না। ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ৫২ প্রজাতির মাছকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে বটে, তবে আইন একা কিছু করতে পারে না। জলাভূমি বাঁচানো, দূষণ কমানো, আর স্থানীয় মানুষকে এই ক্ষতির কথা বোঝানো — এই তিনটে একসাথে না হলে হয়তো আরও কিছু নাম শুধু কাগজেই থেকে যাবে।

← লেখা তালিকায় ফিরে যাও